“মমতারাজে হচ্ছে ক্রাইম হাব”, কাওমের রহনুমাগণ আপনারা চুপ করে আছেন কেন?

0

পাঠকের কলমে,টাইমস্ বাংলা: কথায় বলে – ‘অভাগা যেখানে যায় সাগর শুকিয়ে যায়।‘ প্রবাদটি খুবই সংগতভাবে প্রযোজ্য বাংলার মুসলিমদের ক্ষেত্রে। যে মুসলিম এই দেশে 650 বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজত্ব করে এসেছে, সেই মুসলিম আজ কাগুজে বাঘে পরিণত হয়ে গেছে। স্বাধীনতার পর থেকে মুসলিমদের প্রতি বঞ্চনা, নিপীড়ন, অত্যাচার ক্রমাগত চলছেই। আর এই অত্যাচারের হাত থেকে বাদ নেই বাংলার মুসলিমরা।

বর্তমান রাজ্য সরকারের তৃণমূল সুপ্রিমো দিদি মুসলিম দরদী হয়ে মুসলিমদের জুজু দেখিয়ে মুসলিমদের বিপুল ভোটে জয়লাভ করার পরেও মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ, মুসলিমদের বঞ্চনা, মুসলিমদের উপরে অত্যাচারের মাত্রা কমবে কি বরঞ্চ বেড়ে চলেছে ক্রমাগত। কিন্তু দিদি সেই বামফ্রন্টের 34 বছরের ভুত ছাড়া অন্য কিছু দেখতে পাচ্ছেন না। কিন্তু মুসলিমদের আজ এহেন দুর্দশার জন্য সবচেয়ে বেশি দোষ দিব মুসলিম রহনুমাদের উপরে।


যাই হোক ঘটনার বর্ণনায় আসি, ‘শৈবাল দাশগুপ্ত’ যে একজন RSS -এর প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ক্যাডার, যিনি একজন কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী, যিনি একজন বিজেপি আই. টি. সেলের কর্মীও বটে। জানি না তার মাথার শয়তানি বুদ্ধি বিলোপ পেয়ে, শুভ বুদ্ধির উদয় হয় এবং RSS -এর নোংরা, হিংসাত্মক, মুসলিম বিরোধী কাজকর্মের তথ্য প্রকাশ করেন। প্রাণ হাতে নিয়ে কিছু স্ট্রিং অপারেশন ও করেন। উনার স্ট্রিং অপারেশনের দরুণ উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। যে ভিডিওটি আপনারা দেখছেন সেটা বাংলার রাজধানী কোলকাতার মেটিয়াবুরুজের একটি মসজিদের। যেখানে একজন RSS -এর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সন্ত্রাসবাদী মসজিদে ঢুকে পূজা-পাঠ শুরু করে দেয়। মসজিদে এমন কাজকর্ম দেখে স্থানীয় লোকজন জড়ো হয়ে যান, সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থলে আসে কোলকাতা পুলিশ। পূজাপার্বণ শেষ করার পরে পুলিশ আত্মসমর্পণ করতে বলে, কিন্তু ঐ সন্ত্রাসবাদী আত্মসমর্পণ করা তো দূর অস্ত হাতিয়ার নিয়ে আক্রমণ করে পুলিশের উপরেই। কিন্তু এমন সংবাদ বাংলার মিডিয়া, প্রিন্ট মিডিয়া সকলেই চেপে যায়।

বাংলার মুসলিম সাধারণ জনগণ ইতিমধ্যে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের আস্ফালনের যথেষ্ট টের পেয়েছেন। তারা দেখেছেন এই মুসলিম দরদী মমতা রাজে সংখ্যালঘু উন্নয়নের নামে চটকদারি রাজনীতি, তারা জানেন কি করে ফারজানা আলমকে পরিকল্পনা করে হত্যা করে দেওয়া হয়েছিল, তারা দেখেছেন কি করে এই সরকার হুগলী মাদ্রাসা বন্ধ করেছে, তারা ঈদের দিন শুনেছেন রেড রোডে মুখ্যমন্ত্রীর মিথ্যা ভাষণ, তারা দেখেছেন দমদম বিস্কোরণে এই সরকারের মৌণতা, তারা দেখেছেন ওয়াকফ সম্পত্তির অবৈধ দখলদারি, তারা দেখেছেন মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি এই সরকারের চরম বঞ্চনা, তারা দেখেছেন মথুরাপুরের রানাঘাটায় হিন্দুত্ববাদীদের তান্ডব, তারা দেখেছেন কুচবিহারের ইসলামিক ধর্মসভায় পুলিশের গুলি চালানো, তারা দেখেছেন নদীয়ার ফুকানতলায় হিন্দুত্ববাদীদের তান্ডব, তারা দেখেন বসিরহাটের দাঙ্গায় এই সরকারের ভূমিকা, তারা দেখেছেন ধূলাগড়ের দাঙ্গায় এই সরকারের ভূমিকা, তারা দেখেছেন আসানসোলের দাঙ্গায় এই সরকারের ভূমিকা, তারা দেখেছেন ধর্ষনে এই সরকারের ভূমিকা, তারা দেখেছেন সিগবাতুল্লাহ, শরিফুল গাজী, সৌরভ গুরী হত্যায় এই সরকারের ভূমিকা, তারা দেখেছেন রামনবমীতে হিন্দুত্ববাদীদের আস্ফালন, তারা দেখেছেন আরোও অনেককিছুই- যা বামফ্রন্টের 34 বছরের রাজত্বকালে ও দেখেননি।

মুসলিমদের অবস্থার উন্নতির জন্য বাম শাসনকালে চেষ্টায় কিছু ঘাটতি ছিল একথা অস্বীকার করার নয়। কিন্তু 34 বছরের বাম শাসনকালে মুসলিমদের উপরে এমন অত্যাচার নেমে আসেনি। 34 বছরের বাম শাসনকালে সন্ত্রাসবাদী, রাষ্ট্রবাদী পার্টি বিজেপির একটি টিকিও বাংলায় দেখা যেতো না, প্রয়োজন পড়েনি মোল্লাতন্ত্রের সহায়তার। কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না সারা দেশের মধ্যে শুধুমাত্র বাংলার মুসলিমরা O.B.C. এবং ভূমিসংস্কারের সুফল লাভ করছেন এই বাম সরকারের সৌজন্যে।

মুসলিমরা ছিল মূলত সাড়ে তিন দশকের বামফ্রন্টের ভোট ব্যাঙ্ক। চাকা যখন ঘুরে গেল সেই মুসলিমরাই হলেন তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্ক। আজ সারা রাজ্য জুড়ে চলছে অরাজকতা, মুসলিমদের উপরে অত্যাচারের সুপরিকল্পিত চক্রান্ত। আর মুখ্যমন্ত্রী ভোটের রাজনীতির জন্যই ডেকে এনে রাজ্যে ঢুকিয়েছেন সন্ত্রাসবাদী শক্তিকে । মুখে বলছেন – ‘বামফ্রন্টের হার্মাদ গুলোই এখন বিজেপির জল্লাদ হয়ে উঠেছে!’ বামফ্রন্টের হার্মাদ তো তৃণমূলের গুন্ডা বাহিনীতে পরিণত হয়েছিল। তবে আপনার দল থেকে আবার সন্ত্রাসবাদীদের দলে গেল কি করে? মুসলিম কাওমের রহনুমাগণ প্রশ্ন করতে পারবেন আপনাদের সুপ্রিমোকে?

‘ফিরহাদ হাকিম’, ‘করিম চৌধুরী’, ‘সিদিকুল্লাহ চৌধুরী’, তোতাপাখি ‘রেজ্জাক মোল্লা’, ‘আহম্মদ হোসেন ইমরান’, ‘ইদরিশ আলি’, ‘নূরজ্জামান’ সাহেব আপনাদের কাওমের জনগণ রহনুমা করে কেন পাঠিয়ে ছিলেন? আপনাদের কি ‘নরম হিন্দুত্ব’ -কে প্রশ্রয় দেওয়ার জন্য ভোটে জিতিয়ে পাঠিয়ে ছিলেন এই কাওমের জনগন?

হে আমার কাওমের রহনুমাগণ আপনারা কি জানেন না আপনাদের পার্টি তৃণমূল 8-9 বছর ধরে রাষ্ট্রবাদী পার্টির সঙ্গে ছিল? আপনারা কি জানেন না তৃণমূল সুপ্রিমো, বর্তমান রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দুই দুইবার বিজেপি সরকারের কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন? আপনারা কি জানেন না নরেন্দ্র মোদী যখন চরম নৃশংসতায় গুজরাতে মুসলিম নিধন করছিলেন তখন মমতা ব্যানার্জি তাকে ফুল উপহার দিয়ে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছিলেন ? আপনারা কি জানেন না 2003 সালে 15 ই সেপ্টেম্বর নয়া দিল্লীতে RSS -এর জাতীয় পর্যায়ের অনুষ্ঠানে মমতা ব্যানার্জি বলেছিলেন- ‘আপনারাই সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। আমি জানি আপনারা দেশকে ভালোবাসেন………। যদি আপনারা এক শতাংশ সাহায্য করেন আমরা কমিউনিস্টদের সরাতে পারবো।‘ আপনারা কি জানেন না সেইদিন RSS -এর সভায় ‘এইচ. ভি. শেষাদ্রি’, ‘মোহন ভাগবত’ আপনাদের তৃণমূল নেত্রীকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন- ‘আপনার লড়াইয়ে আমরা সঙ্গে আছি।‘ আপনারা কি জানেন না সেইদিন RSS -এর সভায় বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ ‘বলবীর পুণী’ বলেছিলেন- ‘আমাদের প্রিয় মমতা দিদি সাক্ষাত দূর্গা!’ আপনারা কি জানেন না তৃণমূল সুপ্রিমো RSS -এর সাক্ষাত দূর্গা? আপনারা কি জানেন না পশ্চিমবঙ্গে RSS -এর মতো সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের বৃদ্ধির হার মাত্র চার বছরে 157 শতাংশ? আপনারা কি জানেন না এপ্রিল 2011 সাল থেকে অক্টোবর 2015 সাল পর্যন্ত RSS -এর মতো সন্ত্রাসবাদী সংগঠনের শাখা এই বাংলায় স্থাপিত হয়েছে 1492 টি? আপনারা কি জানেন না সেই সব শাখার চলছে অস্ত্র প্রশিক্ষণ? আপনারা নাকি সেকুলার দল! তবে সাম্প্রদায়িক শক্তি বিজেপির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ‘রাম নবমী’, ‘হনুমান জয়ন্তী’ পালন কেমন সেকুলারিজমের উদাহরণ? আপনারা কি জানেন না সামনের বছরে সাম্প্রদায়িক শক্তি ‘রাম নবমী উৎসব উৎযাপন কমিটি’ নাম দিয়ে ‘রাম নবমী’তে অস্ত্র আস্ফালন করে দাঙ্গা বাঁধিয়ে ছিলো, আর এই বছর তাদের প্রকাশ্য ঘোষণা ‘জন্মাষ্টমী’ পালন করবে ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’ নামক সন্ত্রাসবাদী সংগঠন?

আপনারা সবই জানেন, কিন্তু প্রশ্ন করতে পারবেন না আপনারা। কারণ, আপনাদের নিজেদের স্বার্থের জন্য, নিজেদের পদ টিকিয়ে রাখার জন্য আজ কাওমকে মৃত্যু গহ্বরে ঠেলে দিচ্ছেন আপনারাই। আজ নরম হিন্দুত্ববাদীকে প্রশ্রয় দিতে সাহায্য করছেন আপনারাই। আজ কাওমের সাধারণ মানুষকে অন্ধকারে নিমজ্জিত করে রেখেছেন আপনারাই। মমতারাজে এই বাংলায় ‘ক্রাইম হাব’ হয়েছে, আর আপনারা মৌণতা অবলম্বন করছেন! আপনাদের দাড়ি-টুপি শুধু লোক দেখানোর জন্যই। আপনারা কাওমের দাবী নিয়ে আজ পর্যন্ত একটি টুঁ পর্যন্ত শব্দ উচ্চারণ করেননি। আপনারা কাওমের উপরে আক্রমণ নিয়ে আজ পর্যন্ত সোচ্চার হননি। আপনারা ‘শাহনাওয়াজ হুসেন’, ‘মুক্তার আব্বাস নকভী’ থেকেও অধম। তারা কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদীদের সমর্থক, আর আপনারা ‘নরম ও সুপরিকল্পিত হিন্দুত্ববাদীদের’ সমর্থক। যা কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদ থেকেও মারাত্মক।

জেনে রাখুন রহনুমাগণ আপনাদের মুখোশ উন্মোচিত হয়ে গেছে। ম্যাচ ফিক্সিং করে 2019 -এর লোকসভা এবং 2021 – বিধানসভা জেতার জন্য ওয়াকওভার দিয়ে রাষ্ট্রবাদী শক্তিকে আরোও শক্তিশালী করে নির্বাচনে জেতার কৌশল দিবালোকের মতো প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে। শুনুন রহনুমাগণ, আপনারা কাওমকে বেশীদিন কাওমকে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত করতে পারবেন না। ফ্যাসিবাদী শক্তির রাজত্ব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি ইতিহাস সাক্ষী আছে। আপনাদের কায়ামতের দিন কি প্রশ্ন করা হবে জানি না, তবে আপনারা সতর্ক বার্তা শুনে রাখুন, এইবার যদি কাওমের উপরে আক্রমণ হয়, আর একটা সিগবাতুল্লাহ, শরিফুল গাজীর লাশ পড়ে তবে এই কাওমের যে রক্ত আজ গভীর শোকে শীতল হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে, সেই রক্ত একদিন আগুন হয়ে টগবগ করে ফুটে উঠতে ও পারে।

বি:দ্র: মতামত লেখকের নিজস্ব