সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল কে হিরো অফ হিন্দুত্ব সাজানোর প্রচেষ্টায় বিজেপি

0

ফারুক হোসেন, টাইমস বাংলা : অবশেষে ভারতে পৃথিবীর সব চেয়ে বড় মূর্তি স্থাপিত হয়েছে। ৬০০ ফুট এই মূর্তি সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের মূর্তি, যা কিনা আমেরিকার statute of liberty কে পিছনে ফেলেছে’ তার থেকে চারগুন উঁচু, খরচ করা হয়েছে ভারতীয় মুদ্রায় ৩০০০ হাজার কোটি টাকা। স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। আজাদ ভারতে প্রথম গৃহমন্ত্রীও ছিলেন। আজীবন কংগ্রেসী ছিলেন। এত বছর পরে ঠিক লোকসভা ভোটের আগেই এই বিশাল মূর্তির উদ্বোধন করে নরেন্দ্র মোদি তথা বিজেপি সরকার দেশকে বোঝাতে চাইছেন এই মহান ব্যক্তির প্রতি চরম অবিচার করেছেন কংগ্রেস।

এমন সময়ে মুর্তি গড়ে সর্দার প্যাটেল কে স্বরণ করলেন সরকার তা বলার অবকাশ রাখেনা। গৌরব হলেও এমন সময় টা বেছে নিলেন যে সময় কিনা ভারতের অর্থ ব্যাবস্থা তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে আছে ডলারের তুলনায় রুপিয়া এক্কেবারে তলানিতে ঠেকেছে। গনতন্ত্র সংস্থা গুলি প্রায় ধরাসায়ী হয়ে গেছে, তারপরেও ৩০০০ কোটি টাকা খরচ করে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল কে স্বরণ করে সারা বিশ্বের কাছে মাথা উঁচু করে মঙ্গল গ্রহের কাছে পৌছে দিলেন। যিনি এই গৌরব এনে দিয়েছেন তিনি আর অন্য কেউ নন, আমাদেরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

প্রশ্ন জাগে “সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল তার জীবন কালে যা কিছু ত্যাগ করেছেন দেশের জন্য, দেশের আজাদির জন্য। তার চিন্তাধারা কে ভুলে গিয়ে মূর্তি স্থাপন করে তাকে স্বরণ করছে। হিন্দুত্ববাদের নায়ক হিসাবে তাকে দেশবাসীর কাছে তুলে ধরতে চাইছে। হিরো অফ হিন্দুত্ব পেশ করার চেষ্টা করছে।

যারাই আজ সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল কে নিয়ে নোংরা রাজনীতির মাধ্যমে নিজেদের আইকন হিসাবে মেনে ৩০০০ কোটি টাকা খরচা করে আপনা আদমি বলার চেষ্টা করছে, সেই সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল সারাজীবন এই সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন। মোহন ভগবতদের আরএসএস কে দেশ থেকে নিষিদ্ধ করেছিলেন। স্বরণ করিয়ে দিই, জহরলাল নেহেরু যখন তৎকালীন সময়ে সাম্প্রদায়িক শক্তিকে উচ্ছেদ করার প্রচেষ্টা করছিলেন, হিন্দু মুসলিম দাঙা রুখছিলেন, সর্বদায় সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল জহরলাল নেহেরুর পাশেই ছিলেন দেওয়াল হয়ে।

ভাবার বিষয়, হাস্যকর হলেও চরম সত্য জহরলাল নেহেরু থেকে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল কে সম্পূর্ন আলাদা করতে চাইছে। হোক না দুইজনেই কংগ্রেসি। মদ্দা কথা হলো নেহেরু তথা গান্ধি পরিবারে প্রতি ঘৃনা হিংসা কে আটুট রেখেছে বিজেপি তথা আরএসএস। যতটা লড়াই সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ইংরেজ দের বিরুদ্ধে লড়েছেন ঠিক ততটাই লড়াই সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল আরএসএস এর বিরুদ্ধে লড়েছেন।যতটা ধার্মিক কট্টরপন্থী দের বিরুদ্ধেও লড়েছেন। ততটাই কট্টরপন্থী হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। যে আরএসএস সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল কে খুন করতে চেয়েছিলো, সেই আরএসএস তাকে আপনা করার আপ্রান চেষ্টা করছে মূর্তি গড়ে।

বিজেপির স্বপ্ন, বিচারধারা যে ভাবে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র বানানোর প্রচেষ্টা সেই অপশক্তির বিরুদ্ধে ১৯৪৯ সালে সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল বলেন যারা ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র বানানোর চেষ্টা করছে তারা আসলে পাগলের মতো চিন্তাধারা রাখে।
১৯৫০ সালের ভাষনে তিনি বলেন আমাদের দেশ ধর্মনিরপেক্ষ, এখানে প্রতিটি মুসলিমের ধারনা হওয়া উচিত আমরা ভারতীয় নাগরিক, অন্য ধর্মালম্বী নাগরিকদের মতো তাদেরও সমান অধিকার আছে। আমরা যদি তাদের প্রতি এই চিন্তাধারা না পৌছতে পারি তাহলে আমরা দেশের লায়েক নই। মুসলিমরাও দেশের স্বতন্ত্র আজাদির জন্য লড়াই করেছেন, যা কিনা আরএসএস নামক সাম্প্রদায়িক সংগঠন করেনি। বরং ইংরেজদের সহযোগিতা করেছে। (উপরেরে কয়েকটি লাইন বিপিনচন্দ্রের লেখা আাজাদি কি বাত ভারত – বই থেকে)

সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল যখন আরএসএস কে নিষিদ্ধ করেন তখন তিনি গোলবার কে এক চিঠি লেখেন, তিনি চিঠিতে লেখেন আরএস এস এর ভাষনে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি হয়। দেশের অন্তিম ফলাফল মহাত্মা গান্ধী কে হত্যা। এদেশের সরকার তথা সচেতনশীল সেকুলার নাগরিকদের বিন্দু মাত্র আরএসএস এর প্রতি সহানুভূতি নেই। গান্ধীজী কি হত্যার পর আরএসএস তথা আপনার সংগঠন আনান্দ উৎসব পালন করেছে এমনকি মিষ্টি বিতারন করেছে। তারফলে আরএসএস এর প্রতি বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। এই পরিস্থিতি আরএসএস কে নিষিদ্ধ করা ছাড়া আমার তথা আমার সরকারের কোন উপায় নেই।

আরএসএস এর উপর যখন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়, তখনই সুপ্রিমকোর্ট কে হলফ দেন কোন ধরনের রাজনৈতিক দলে ভিড়তে পারবে না, এমন কি তারা কোন দিন রাজনীতি নামবেন না, কেবল সংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে থাকবেন। অন্যান্য সংগঠনের মতো সমাজসেবা কাজে নিযুক্ত থাকবেন। এই শর্তসাপেক্ষে সুপ্রিমকোর্ট নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। আজ সব কিছুকে তুচ্ছ মনে করে বিজেপি নামক সাম্প্রদায়িক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশে সাম্প্রদায়িক মহল তৈরি করছে, যার নেতৃত্ব দিচ্ছে বিজেপি নামক রাজনৈতিক সংগঠন।
সর্দার বল্লব ভাই প্যাটেলের মুর্তি উদ্বোধন ভাষনে নরেন্দ্র মোদি বললেন দেশে একতা প্রয়োজন অতি জরুরী, বিভাজনে আমরা বিশ্বাস করিনা।

প্রশ্ন হলো, মুর্তি স্থাপনে তাহলে কি একতা আসবে দেশে? বিভাজন তৈরি না হয় তার জন্য কি ৩০০০ কোটি টাকার মূর্তি স্থাপন কি ভীষন জরুরী?

সর্বশেষ বলতে পারি সর্দার বল্লভভাই প্যাটেলের
মূর্তি উদ্বোধন দিয়েই ২০১৯ এর লোকসভার প্রচার শুরু করলেন নরেন্দ্র মোদি তথা বিজেপি।