বাঙালী মুসলিমদের উত্তরণের পথ খুঁজতে শহরে শুরু হল দুদিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন

0
international conference began in the city for Bengali Muslims

নিজস্ব প্রতিনিধি, টাইমস্ বাংলা, কলকাতা: বাঙালী মুসলিমদের উত্তরণের পথ খুঁজতে আজ থেকে কলকাতায় আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ক সার্কাস ক্যাম্পাসে শুরু হল দুদিনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন। আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিককতা ও গণসংযোগ বিভাগ ও বেঙ্গলি একাডেমিয়া ফর সোশ্যাল এমপাওয়ারমেন্ট ব বেসের উদ্যোগে ‘ Bengal Muslims at the Crossroads, Possibilities and challenges’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নিলেন দেশ, বিদেশের অধ্যাপক, সমাজকর্মীরা। বাঙালী মুসলিমদের দুর্বলতা, প্রতিবন্ধকতাকে চিহ্নিত করে উত্তরণের দিশা দেখালেন আলোচনায় অংশগ্রহনকারী সকল বক্তাই।

এদিন আলোচনার প্রধান বক্তা ছিলেন কেন্দ্রীয় সরকার গঠিত পোস্ট সাচার কমিটির চেয়ারম্যান তথা দিল্লীর জওহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অমিতাভ কুন্ডু। অমিতাভবাবু ‘ concerns in formulating an inclusive development strategy : focus on bengali muslims’ শীর্ষক বক্তব্যে সাম্প্রতিক বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ” সারা দেশের তুলনায় রাজ্যে মুসলিমদের সংখ্যা গত দশ বছরে বেড়েছে মনে হলেও, আদতে রাজ্যের সংখ্যা গত ১০ বছরে যা বেড়েছে তার তুলনায় মুসলমানদের জনসংখ্যা কমেছে। রাজ্যে বসবাসকারী মুসলিমরা উচ্চবর্নীয় হিন্দু, তপশীলি জাতি ও উপজাতির বাসিন্দাদের চেয়ে লিঙ্গ অনুপাত, জন্ম নিয়ন্ত্রন সম্পর্কে অনেক বেশি সচেতন।


শিশু মৃত্যুর হারও তুলনামূলক কম। কিন্তু শিক্ষাগ্রহণের দিক থেকে তারা অন্য রাজ্যের চেয়ে পিছিয়ে আছে। এরজন্য স্থানীয় সরকারই দায়ী। শহুরে ও গ্রাম্য মুসলিমদের মধ্যে বিরাট অসাম্য রয়েছে। এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির লোন দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাঙালী মুসলিমরা অন্যান্য রাজ্যের মুসলিমদের থেকে পিছিয়ে রয়েছে। শহুরে মুসলিমদের মধ্যে দারিদ্রতা বেশি অন্যান্য রাজ্যের তুলনায়। নতুন শহরগুলিতে মুসলিমদের জনসংখ্যা বাড়লেও, পুরোনো বড় শহরে উল্লেখযোগ্য ভাবে তাদের বসবাস কমেছে। রাজ্যে গ্রাম থেকে শহরে মুসলমানদের আসাও কমেছে।” ওবিসি সংরক্ষণ তাদের শিক্ষার দিকটাকে কিছুটা উন্নত করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে সব রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে মুসলমানরা যে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতের সঙ্গেই মত মেলাবে এমন কোন কথা নেই বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

আল- আমীন মিশনের প্রতিষ্ঠাতা নুরুল ইসলাম বলেন, ” বাঙালি মুসলিমদের মধ্যে উদ্ভাবনী, সদর্থক চিন্তাভাবনার অভাব রয়েছে। সেটা দূর করতে হবে। শুধু রাষ্ট্রের দিকে আঙ্গুল তুললেই হবে না, নিজেদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে। আরো উদ্যোগী হতে হবে।” যারা সমাজে প্রতিষ্ঠিত , জ্ঞানী তাদের অপেক্ষাকৃত কম জ্ঞানীদের জ্ঞান বিতরণের পরামর্শ তিনি দেন। বাংলাদেশের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ খান্দকার মাহমুদ হাসান মুসলিম সমাজের পশ্চাদপদতা দূর করে চিন্তার আধুনিকতা আনার পক্ষে সওয়াল করেন।

রাজ্যসভার সাংসদ আহমেদ হাসান ইমরান বলেন, ” মুসলিম সমাজ থেকে মধ্যবিত্তরা হারিয়ে গেছে। তার জন্যই এদের অগ্রগতি থমকে গেছে। এদের নিজেদের দাবি ও অধিকার নিজেদের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আদায় করে নিতে হবে। চ্যালেঞ্জকে সুযোগে পরিণত করতে হবে।” বেসের প্রতিষ্ঠাতা কাজী মহম্মদ শেরিফ বলেন, ” মুসলিম সমাজের প্রতিবন্ধকতাগুলিকে আগে চিহ্নিত করতে হবে। তাহলেই সেই প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ সঠিকভাবে নেওয়া হচ্ছে কিনা তা যাচাই করা যেতে পারে।”বাংলাদেশের কুষ্টিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক হাবিবুর রহমান ‘ বাঙালী মুসলমানদের মননচর্চা সমীক্ষা’ আলোচনায় বলেন, ” মুসলমানদের ঈশ্বরকেন্দ্রিক চিন্তাধারা ঝেড়ে ফেলে, মনুষ্যকেন্দ্রিক চিন্তাধারা গ্রহণ করতে হবে। পুরোনোকে সঙ্গে নিয়েই আধুনিকতাকে গ্রহণ করতে হবে।” তিনি বলেন, মেধার ভিত্তিতেই মুসলমানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও চাকরিতে নিয়োগ হওয়া উচিত, শুধু ওবিসি সংরক্ষণের ভিত্তিতে নয়। প্রতিটি ইন্টারভিউ বোর্ডে তিনি একজন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ব্যক্তি রাখারও দাবি জানান। তিনি আরও বলেন, ” হিন্দু ও মুসলমানদের বিরোধ মোটেই ধর্মীয় নয়, বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক”।

এদিনের সম্মেলনে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মহম্মদ আলি বক্তব্য রাখেন। আলিয়ার অধ্যাপক আমজাদ হোসেন, প্রতিচী ইনস্টিটিউটের জাতীয় গবেষণা কো অর্ডিনেটার সাবির আহমেদ, রামকৃষ্ণ সারদা মিশন বিবেকানন্দ বিদ্যাভবনের অধ্যাপিকা ডক্টর অনুসুয়া চ্যাটার্জী বিভিন্ন বিষয়ের উপর বক্তব্য রাখেন।