‘উদার আকাশ’ পত্রিকা : পাঠকের অনুভূতি

0
udar akash-magazine-the-readers-sentiment

ইসমাইল জমাদার

‘আকাশ আমায় শিক্ষা দিল উদার হতে ভাইরে –‘ আকাশের মত উদার। উদার আকাশ। এপার বাংলায় জনপ্রিয় একটি পত্রিকার নাম। দীর্ঘ আঠারো বছর যাবৎ প্রকাশিত এই মননশীল পত্রিকাটির ঈদ-শারদ উৎসব সংখ্যা ১৪২৬ হাতে পেলাম। সম্পাদক ফারুক আহমেদ। এই সংখ্যার বিশেষ বিষয় , সহাবস্থান ও সমন্বয়।
প্রচ্ছদ ভাবনায় সহ সম্পাদক মৌসুমী বিশ্বাস। বিষয়ের সঙ্গে অসাধারণ মেলবন্ধন, কাগজও উন্নত মানের। মূল্য ৮০ টাকা, পাতিরাম, দে’জ, মল্লিক ব্রাদার্স, অভিযান ও নিউ লেখাতে পাওয়া যাবে উদার আকাশ পত্রিকা ও প্রকাশনের গ্রন্থ।
ঘটকপুকুর, ভাঙড়, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলা থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হয় উদার আকাশ পত্রিকা।

পড়লাম। সর্বপ্রথমেই সম্পাদকীয়। সম্পাদক সাহেব যে বিষয়টির কথা তুলে ধরেছেন তা হলো মুসলিমদের উচ্চ শিক্ষায় সরকারের ভূমিকা সংক্রান্ত। এই কথা বলতে গিয়ে তিনি সরকারের একটি দপ্তর ‘সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগমে’র ঋণ দেওয়ার জটিল পদ্ধতির কথা বলেছেন। ঋণ গ্রহীতাকে একজন সরকারি কর্মচারীকে গ্রান্টার হিসেবে যোগাড় করতে হবে। কোথায় পাবে গ্রান্টার? বিপুল জনসংখ্যার মানুষের ভিতরে সরকারি চাকরিজীবী নগন্য। নেই বললেই চলে। কেউ থাকলেও কেন সে তার গ্রান্টার হতে যাবে?

ব্যাক্তিগত ভাবে আমার মনে হয়েছে এ যেন নীতিকথার সেই ‘শেয়াল-সারস’ এর গল্প। শেয়ালকে দাওয়াত করেছে সারস। খেতে দিয়েছে মাটির কলসিতে। যে কলসির মুখ এতটাই সরু যে শেয়ালের মুখ ঢোকে না।

সরকারের টাকা আছে কলসিতে। নিয়ম রক্ষার জন্য দাওয়াতও করছে। সংখ্যালঘু ছেলেমেয়েদের মুখ ঢোকানোর উপায় নেই। খাবে কি?

এই বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর ভাবা উচিত। তার কাছে সংখ্যালঘু মানুষেরা প্রত্যাশা করে সুবন্দোবস্তের।

সম্পাদকীয়টির জন্য ফারুক আহমেদকে অনেক ধন্যবাদ জানাই।

অনেকগুলি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশ হয়েছে। মইনুল হাসান সাহেবের ‘স্বাধীনোত্তর বাংলায় সংখ্যালঘু উন্নয়ন : একটি মনস্তত্ত্বিক বিশ্লষণ’ — বেশ গুরুত্বপূর্ণ রচনা। মইনুল সাহেবের কথা নতুন নয়। তবু একটি একটি করে উদাহরণ প্রয়োগ করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন যে কতটা হতাশাগ্রস্থ হলে একটি জনজাতির এমন মানসিকতার জন্ম হয়।

মুসলমানদের অনুন্নয়নের বীজ কি নিজেদের ভাবনায় নিহিত আছে, না-কি বাইরে থেকে প্রযুক্ত বলের প্রভাবও আছে? সেটাও তিনি সুন্দর করে তুলে ধরেছেন। তার সাথে একমত যে পুরনো দিনের ঐতিহ্যগুলিকে অস্বীকার না করে হৃদয়ে গ্রহণ করতে হবে। আধুনিকতামনস্ক হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।

 

উদার আকাশ পত্রিকার এই সংখ্যার গুরুত্বপূর্ণ বিশেষ রচনা ‘সহাবস্থান ও সমন্বয়’। এটি লিখেছেন প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক একরামূল হক শেখ। ‘সহাবস্থান’ ও ‘সমন্বয়’ বিষয় দুটি ভারতীয় সংস্কৃতিতে অঙ্গীভূত। সেটা কেউ স্বীকার করুক আর না করুক। হাজার বছর পাশাপাশি বসবাস করেও ভারতের দুটি প্রধান ধর্মাবলম্বীর মানুষ নাকি একে অপরের কাছে বড্ড অচেনা হয়ে আছে। এ কথাটি প্রায়ই শোনা যায়। আমার মনে হয় কথাটিকে এতোটা সরলীকরণ করা ঠিক নয়। উভয় উভয়কেই চেনে, জানে। আর চেনে বলেই সংঘাতটা হয়ে ওঠে অনিবার্য। কারণ, সেই চেনাটা বাস্তবের মাটি থেকে হয়না। জানাটা হয় মিথ্যে ইতিহাস, অতিরঞ্জিত অপপ্রচারের কারণে। এই সংঘাত মূলত এক একপক্ষীয়। কারণ দেশের দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ বা প্রধান সংখ্যালঘু সমাজ ইতিহাস তৈরিতে কিংবা গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ, কোনও ক্ষেত্রেই উপস্থিত নেই সেরকম। ফলে এমন হীনপ্রচেষ্টা তাদের দ্বারা কম হওয়া স্বাভাবিক। বরং লাগাতার তাদের বিরুদ্ধেই প্রচারণা চলে আসছে বছরের পর বছর। সর্বক্ষেত্রে প্রথমের সংখ্যাধিক্য থাকায় দ্বিতীয়টিকে এক রকম অবহেলা, অবজ্ঞা করতে থাকা স্বাভাবিক হয়ে গেছে।

ফলে ‘সহাবস্থান’ বিষয়টি হয়ে গেছে বিপজ্জনক। যে যার বিশ্বাস, আচার, রীতিনীতি বজায় রেখে সমাজে পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ বসবাসের নাম যদি হয় সহাবস্থান, তবে এই ধারণাটির উপর ক্রমশই আক্রমণ চলছে কিছু হীনভাবনার মানুষের দ্বারা।

‘সমন্বয়’ — একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এর জন্য সচেতনভাবে প্রয়াস করতে হয় না। প্রাবন্ধিকেরও মত তেমনটিই। কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্নধারার দুটি রিলিজিয়নের মধ্যে সমন্বয় — আসলে দুটি রিলিজিয়নের অস্তিত্বটিকেই বিপন্ন করে তোলে। তাদের বৈশিষ্ট্য বজায় থাকে না। বৈদিক হিন্দু ধর্মের আচার-আচরণের সীমারেখা নাকি অসীম। তাই তাদের গ্রহণ-বর্জনে সমস্যা নেই। সত্যিই কি তাই? তৌহিদবাদী ইসলামের কাছ থেকে তারা কিছু গ্রহণ করেছে কি না জানা নেই, তবে যা গ্রহণ করেছে, তা নির্ভেজাল ইসলামি ভাবধারার সাথেই সংঘর্ষিক। প্রসঙ্গটি চেনাজানা নিয়ে।

প্রাবন্ধিককের সঙ্গে একমত যে একজন মুসলিম বালক হিন্দু সংস্কৃতি, হিন্দু বিশ্বাস সম্পর্কে যতোটা ওয়াকিবহাল, একজন হিন্দু বালক তার সিকিভাগও আয়ত্ত করতে পারে না। এই না পারাটার মূল কারণ বোধহয় মানসিকতার দেওয়াল। যা টপকাতে গেলে নিজ সমাজের কাছে অপাংক্তেয় হয়ে যাওয়ার ভয় কাজ করে। আজকের দিনেও আক্ষেপ শোনা যায় যে কোনও পত্রিকার সম্পাদক এক তৃতীয়াংশ জনজাতি মুসলমানদের প্রধান উৎসব ঈদ উপলক্ষে একটি ‘ঈদ সংখ্যা’ প্রকাশ করার সাহস রাখতে পারে না।

সেই জায়গায় আলোচ্য পত্রিকাটিই বরং ঈদ ও শারদ সংখ্যা প্রকাশ করেছে।

নিজ বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে সমন্বয় কতোটা সম্ভব জানি না, তবে সহাবস্থানটি সম্ভব। যদি সহিষ্ণুতাকে গ্রহণ করা যায় তবে সহাবস্থানবাদী হওয়াটা সহজ। প্রবন্ধটির মূল কথা বোধহয় এটাই।

একরামূল হক শেখ সাহেবকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই এমন বস্তুনিষ্ঠ একটি প্রবন্ধ উপহার দেওয়ার জন্য।

আদ্যন্ত পড়ার সময় হয়নি। তথাপি নজর কাড়া কয়েকটি গল্প পড়লাম। মোশারফ হোসেনের ‘পুরানো আয়না’ ভালো লাগলো। ‘আজও মানুষ আছে’ গল্পের লেখক সৈয়দ রেজাউল করিম। বেশ সুন্দর গল্প।

কবিতা বিভাগের বেশ কয়েকটি কবিতা ভালো লেগেছে। সুবোধ সরকার-এর দুটি কবিতা তৈমুর খানের পিপাসা, হারাধন চৌধুরীর ‘প্রেমিকার মধ্যে মা জেগে ওঠে’ কিংবা আবদুস শুকুর খানের ‘ঘোড়া ছুটছে’ কয়েকবার করে পড়লাম মনের না বলা কথা বলে কবিতা। বাংলাদেশের কয়েকজন কবির কবিতা পাঠ করলে ভালো লাগে এমি জান্নাত, শেখ সাদি মারজান। দুর্দান্ত প্রবন্ধ লিখেছেন মো: রেজাউল করিম।

তুহিনা বেগমের প্রবন্ধ ‘মাঠ যাদু জানে : চাষী জীবনের আয়নায় মহাজীবনের সুর — পড়লাম। প্রয়াত উপন্যাসিক সোহরাব হোসেনের এই উপন্যাস আগে পড়া ছিল। ফলে সেই আলোচনা ঋদ্ধ করলো আমাকে।

সবশেষে ‘উদার আকাশ’ পত্রিকার শুভ কামনা করি। ধন্যবাদ জানাই সম্পাদক ফারুক আহমেদ সাহেবকে। যিনি তার অভীষ্ট লক্ষ্যে গতিশীলতার সাক্ষর রেখে চলেছেন প্রতিটা সংখ্যায়।

আরও গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ আছে সংখ্যাটি পাঠককে নাড়া দেবে।

বিশেষ বিষয় সহবস্থান ও সমন্বয় নিয়ে দারুণ গল্প লিখেছেন অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়।

উদার আকাশ পত্রিকার এই বিশেষ সংখ্যাটি শিক্ষা প্রসারে এসময়ের দানবীর মোস্তাক হোসেন সাহেবকে উৎসর্গ করা হয়েছে।

সেপ্টেম্বর মাসের শেষে উদার আকাশ পত্রিকা উদ্বোধনও করেছিলেন মোস্তাক হোসেন।

উদার আকাশ পত্রিকার সম্পাদক ফারুক আহমেদ এর সঙ্গে যোগাযোগ করতে কল করতে পারেন এই মোবাইল নম্বরে: 7003821298